শুক্রবার, ১৭ Jul ২০২৬, ০৫:০৪ অপরাহ্ন

উপবৃত্তির টাকা যায় প্রধান শিক্ষকের ব্যাগে!

নিজস্ব প্রতিবেদক, নগরকন্ঠ.কম : নওগাঁর রাণীনগরের শিয়ালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকা শিক্ষক লায়লা আরজুমানের ব্যাগে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও ওই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের ভর্তি, স্কুলে কোচিং করার নামে প্রতিবন্ধীদের ভাতার কার্ড, ভুয়া শিক্ষার্থী দেখিয়ে উপবৃত্তির টাকা হাতিয়ে নেওয়াসহ নানা অভিযোগ উঠেছে ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। ১০ বছরের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ওই বিদ্যালয়ে আশঙ্কাজনক হারে কমতে শুরু করেছে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা। ভেঙ্গে পড়েছে পাঠদানের সুষ্ঠু পরিবেশ।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা একডালা ইউনিয়নের শিয়ালা গ্রামে অবস্থিত ৪৬ নং শিয়ালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯১০ সালে এই অঞ্চলের মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি স্থাপন করেন এই বিদ্যালয়টি। কয়েকটি গ্রামের শিক্ষার্থীরা এই বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠগ্রহণ করে আসছে। ১০বছর আগে প্রধান শিক্ষক হিসেবে এই বিদ্যালয়ে যোগদান করেন লায়লা আরজুমান বানু। তিনি যোগদান করার পর থেকে শুরু করেন নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি। সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে বিদ্যালয়ে ১০-১২ জন ভুয়া শিক্ষার্থী দেখিয়ে নিজের ও পরিবারের সদস্যর মোবাইল ফোন নাম্বার দিয়ে উপবৃত্তির টাকা গ্রহণ করে আসছেন। বিদ্যালয়ে বর্তমানে ১৩১ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এদের মধ্যে ৮ জন বাক, শ্রবণ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে ২জন শিক্ষার্থী স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রতিবন্ধীর ভাতা পায়। প্রতিবন্ধী এই সব শিক্ষার্থীদের ভাতার কার্ড করার জন্য প্রতিজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা নেন ওই শিক্ষিকা। এছাড়াও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোচিং করার নামে আদায় করেন কোচিং ফি। গতবছর এই বিদ্যালয় থেকে উপবৃত্তি পেয়েছে ১৪৬ জন শিক্ষার্থী। চলতি বছর ১২২জন শিক্ষার্থী উপবৃত্তির আওতায় এসেছে। এছাড়াও বিদ্যালয়ের পুরাতন পরিত্যক্ত ভবন অপসারণের জন্য দরপত্র দেওয়া হলে ওই প্রধান শিক্ষিকার স্বামী একই ইউনিয়নের উজালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কর্তাব্যক্তিদের ম্যানেজ করে স্বল্প টাকায় দরপত্র নেন। দরপত্রে বিদ্যালয়ের পূর্বদিকের টয়লেটের কথা উল্লেখ্য না থাকলেও স্ত্রীর যোগসাজসে টয়লেটের ছাদসহ অর্ধেকের বেশি অংশ ভাঙ্গার পর অভিযোগের ভিত্তিতে তা ভাঙ্গা বন্ধ করে দেন কর্তৃপক্ষ।

এছাড়াও স্কুলের স্লিপের টাকা, উন্নয়ন খাতে আসা বিভিন্ন অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শিক্ষকের এমন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষকরা। এতে করে প্রধান শিক্ষক তার নিজের ইচ্ছে মাফিক কর্মকাণ্ড করায় ভেঙ্গে পড়েছে বিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পাঠদানের পরিবেশ। আশঙ্কাজনক হারে কমছে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা। এছাড়াও স্কুলের পরিত্যক্ত ৫০-৬০টি ব্রাঞ্চসহ অন্যান্য উপকরণগুলোও তিনি বিক্রয় করেছেন।

প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী শ্রাবনী, রোকেয়া ও মিমসহ অনেকেই জানায়, ভাতার কার্ড করতে ম্যাডামের অনেক পরিশ্রম করতে হয়। অনেক টাকা খরচ হয়। তাই আমরা ১হাজার টাকা দিতে গেলে তা না নেওয়ায় দেড় হাজার টাকা করে ম্যাডামকে দিয়েছি।

আরো পড়ুন: অস্ট্রেলিয়ার দাবানল: জরুরি সহায়তা প্রয়োজন ১১৩ প্রজাতি প্রাণীর

অভিভাবক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘মেয়ে ও চাচাতো বোন রোকেয়াকে ভর্তি করাতে ম্যাডাম আমার নিকট থেকে ২০০টাকা নিয়েছে। আরেক অভিভাবক আশরাফুন নেছা বলেন, ‘তাছলিমাকে ভর্তি করাতে প্রধান শিক্ষক আমার নিকট থেকে ৬০০টাকা দাবি করেন। এরপর ৫০০ টাকা দিয়ে ভর্তি করে করেছি।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লায়লা আরজুমান বানু বলেন, ‘উপবৃত্তির কাজ করতে গেলে অনেক কষ্ট ও অর্থ খরচ হয়। তাই শিক্ষার্থীরা আমাকে এই সব কাজ করে দেওয়ার জন্য খুশি হয়ে মিষ্টি খাওয়ার জন্য কিছু টাকা দেয়। পূর্বে উপবৃত্তির তালিকায় কিছুটা সমস্যা ছিলো। কিন্তু বর্তমানে কোন সমস্যা নেই। আর অন্যান্য অভিযোগগুলো সম্পন্ন মিথ্যে।’

বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান পিটিআই কমিটির সভাপতি জিয়াউর রহমান বুলেট বলেন, ‘এই শিক্ষক বিদ্যালয়ের সকল খাতে ঘাটতি দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেন। এছাড়াও বিগত সময়ে তার নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও কোন লাভ হয়নি। শিক্ষকের এই সব কর্মকাণ্ডের কারণে কমতে শুরু করেছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আর অন্যান্য শিক্ষকদের সঙ্গে মিল না থাকায় ভেঙ্গে পড়েছে সুষ্ঠু পাঠদানের পরিবেশ।’ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল বাসার শামছুজ্জামান বলেন, ‘শিক্ষকের এই সব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে এখনোও কেউ কোন অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ ও উপযুক্ত প্রমাণাদি পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

নগরকন্ঠ.কম/এআর

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com